প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ভেনেজুয়েলার মানচিত্রকে আমেরিকার ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে চিত্রিত করে একটি বিতর্কিত গ্রাফিক পোস্ট করেছেন। এএফপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই মানচিত্রে ভেনেজুয়েলার ভৌগোলিক সীমানার মাঝে একটি আমেরিকান পতাকা প্রদর্শন করা হয়েছে।
বুধবার (১৩ মে, ২০২৬) ট্রাম্প যখন একটি উচ্চ-পর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন, ঠিক তখনই এই উস্কানিমূলক পোস্টটি প্রকাশিত হয়। এর আগে ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান জানানো হয়েছিল:
সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তার দেশ কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার কথা চিন্তা করেনি।
হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান: গত জানুয়ারিতে সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী আটক করার পরও তারা মার্কিন আধিপত্য বা হস্তক্ষেপ মেনে নিতে রাজি নয় বলে জানান রদ্রিগেজ।
নির্বাচন প্রসঙ্গ: দেশে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের দাবি জানালেও রদ্রিগেজ গত ১ মে জানান যে, নির্বাচনের সঠিক সময় সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন; এটি কেবল ‘কোনো এক সময়ে’ অনুষ্ঠিত হবে।
গত সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি নতুন অঙ্গরাজ্য করার পরিকল্পনার কথা জানান। তার দাবির মূল ভিত্তিগুলো হলো:
নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, গত কয়েক মাস ধরে তিনি তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক: রদ্রিগেজ ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ভেনেজুয়েলার খনি ও তেল খাত বিদেশি বিনিয়োগের জন্য, বিশেষ করে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে এই সংকট ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত লাতিন আমেরিকায় মার্কিন বৈদেশিক নীতির বিবর্তনের একটি চরম বহিঃপ্রকাশ।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও মনরো ডকট্রিন (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে আমেরিকা 'মনরো ডকট্রিন' ও 'রুজভেল্ট করোলেরি'র মাধ্যমে লাতিন আমেরিকায় তাদের প্রভাব বলয় শক্তিশালী করতে শুরু করে। ১৯০০ সালের সেই সময়েও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে আমেরিকা বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ করত, যার আধুনিক রূপ আমরা ২০২৬ সালে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ দাবির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।
শীতল যুদ্ধ ও সরকার পরিবর্তন (১৯৭১-১৯৯০): ১৯৭১ সাল পরবর্তী সময়ে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটিয়ে নিজেদের অনুগত সরকার বসানোর যে ইতিহাস আমেরিকার রয়েছে, জানুয়ারিতে মাদুরোকে আটক করার ঘটনাটি সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ও ২০২৬-এর বাস্তবতা: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশে যেমন গণতন্ত্রের নতুন আশা জাগিয়েছে, তেমনি ২০২৬ সালে বৈশ্বিক রাজনীতিতে সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ তত্ত্ব মূলত ১৯০০ সালের সেই পুরনো সাম্রাজ্যবাদী চিন্তারই একটি ডিজিটাল সংস্করণ।
২০২৬-এর প্রেক্ষিত: ১৯০০ সালের সেই গানবোট ডিপ্লোম্যাসি বা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের যুগ থেকে ২০২৬ সালের এই ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ ও ডিজিটাল মানচিত্রের রাজনীতিতে পৌঁছেও লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে। রদ্রিগেজের মার্কিন বিনিয়োগ উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত এবং ট্রাম্পের ‘নিয়ন্ত্রণ’ দাবি প্রমাণ করে যে, ২০২৬ সালের এই বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তির সাথে রাজনৈতিক মানচিত্রের এক গভীর দ্বন্দ্ব চলছে।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রকে জোরপূর্বক অঙ্গরাজ্য করার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। ১৯০০ সালের সেই পরাধীন আমল থেকে ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক যুগে দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই উস্কানিমূলক পোস্ট লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার খনি ও তেল খাত উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্তটি যদি রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে হয়, তবে তা ২০২৬ সালের মে মাসের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।
সূত্র: ১. ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্ট ও ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত এএফপি-র প্রতিবেদন (১৩ মে, ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: বিংশ শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপ ও বৈদেশিক নীতির ইতিহাস (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |